মোনাজাত উদ্দিনমোনাজাত উদ্দিন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের একটি স্মরণীয় নাম। শুধু সাংবাদিক নন তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। ডেস্কে বসে সাংবাদিকতা নয় তিনি ছিলেন তৃণমূল মানুষের সংবাদ কর্মী, ছিলেন জনগণের সাংবাদিক । খবরের অন্তরালে যে সব খবর লুকিয়ে থাকে তিনি ছিলেন সেই সব তথ্যানুসন্ধান এবং রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে। গ্রামে গঞ্জে, পথ থেকে পথে ঘুরে ঘুরে এই তথ্যানুসন্ধানী সংবাদকর্মী তাঁর সাংবাদিক জীবনে নানা মাত্রিকতার রিপোর্ট করেছেন। পাশাপাশি লিখেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ নানা ঘটনা।

১৯৭৬ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন পত্রিকাটির সাথে। বিশ বছর একটানা ‘সংবাদ’ এ কাজ করার পরে ১৯৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল দৈনিক জনকণ্ঠে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন । মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সংবাদ ও মোনাজাত উদ্দিন।

তৃণমূল সংবাদ কর্মী বাংলার চারণ সাংবাদিক মোঃ মোনাজাত উদ্দিন-এর জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৮ জুন রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার মরনিয়া গ্রামে। পিতা মোঃ আলিমউদ্দিন আহমদ, মাতা মতি জানন্নেছা। আলিমউদ্দিন আহমেদ ছিলেন সেযুগের মেট্রিক পাশ। কর্মজীবনে রংপুর পৌরসভায় উচ্চমান করণিক, রংপুর এসপি অফিসের প্রধান করণিক ছিলেন মোঃ আলিমউদ্দিন। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের হিসাব রক্ষক হিসেবে। রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় ছিল তাঁর আবাস। আলিমউদ্দিন ‘আম্বিয়া চরিত’ নামে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। অপ্রকাশিত ‘আধুনিক যোদ্ধা’ নামে একটি বইয়ের পান্ডুলিপিও রচনা করেছিলেন।

মরনেয়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে মোনাজাত উদ্দিন রংপুরের এক সময়ের নাম করা রংপুর কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাশ করে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে এবং মানবিক শাখা থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজেই। কলেজে পড়ার সময় মোনাজাত উদ্দিন শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এসময় তিনি প্রচুর ছড়া ও কবিতা লেখেন এবং অঙ্কন শিল্পী হিসেবেও কলেজে বেশ সুনাম অর্জন করেন। কিন্তু বিএ (পাস) পড়াকালীন হঠাৎ করেই পিতার মৃত্যুতে পরিবারের দায়-দায়িত্ব নিতে হয় মোনাজাত উদ্দিনকে। বাধ্য হন লেখাপড়া ছেড়ে দিতে। রংপুর থেকে কয়েক কিমি দূরত্বের নিসবেতগঞ্জ সরকারী প্রাইমারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। কিছু দিন শিক্ষকতার পরে তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে হিসাব রক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর কাছে এই পেশা ভালো লাগেনি, তিনি মানিয়ে নিতে না পেরে চাকুরী ছেড়ে দেন। এছাড়া তিনি কিছুকাল কাজ করেন রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির ক্যাটালগার হিসেবে। হাতের লেখা সুন্দরের কারণে এই কাজটি তিনি অনায়াসেই পরিছন্নভাবে করতে পারতেন। পিতার মৃত্যুতে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও চাকুরীর পাশাপাশি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে বি.এ পাশ করেন তিনি ।

মোনাজাত উদ্দিনের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ছাত্র অবস্থাতেই। তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ‘বগুড়া বুলেটিন’ পত্রিকার মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকার ‘দৈনিক আওয়াজ’ পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করেন স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে । পরে কিছুদিন ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় কাজ করে ১৯৬৬ সালে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি হিসেবে কাজে যোগদান করেন। স্বাধীনতার পর রংপুর থেকে প্রকাশিত স্থানীয় দৈনিক রংপুর বন্ধ হয়ে গেলে অর্থাভাবে পরেন তিনি। কারণ তখন ঢাকায় ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকাও বন্ধ । মোনাজাত উদ্দিনকে তাই জীবিকার তাগিদে একটি কীটনাশক কোম্পানিতে চাকুরী নিতে হয় বাধ্য হয়ে।

চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে রংপুরের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘‘দৈনিক রংপুর’’ এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবেও। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস আর আদর্শের ভিত্তিতে প্রকাশ করেন ‘দৈনিক রংপুর’। শুধুমাত্র স্থানীয় সংবাদের ভিত্তিতে তিনি এই পত্রিকাটি বের করার চিন্তা করেন। ‘দৈনিক রংপুর’ ছিল মিনি সাইজের পত্রিকা, দাম মাত্র পাঁচ পয়সা। মোনাজাত উদ্দিন ছিলেন এর সম্পাদক-প্রকাশক। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করতেন একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী। বাহ্যিকভাবে সেই ব্যবসায়ী সৎ মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন অসৎ ব্যবসায়ী। যে কারণে তাঁর সঙ্গে মোনাজাত উদ্দিনের সম্পর্কের ইতি ঘটে। অবধারিতভাবেই এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু লেখালেখির সাথে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটেনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।

 

 

সাংবাদিকতার পাশাপাশি মোনাজাত উদ্দিন প্রচুর সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের কুসংস্কার, অন্ধতা দূর করতে তিনি তরুণদের নিয়ে সংগঠন করেছেন। কখনো তাদের নিয়ে নাটক করিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলতে। তিনি নিজেও ছিলেন একজন গীতিকার ও নাট্যকার। তিনি রংপুর বেতারে নিয়মিত কাজ করতেন। তাঁর একাধিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। যদিও চারুশিল্পে তাঁর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু নিজের অধ্যাবসায়ের ফলে তিনি অনেক বই ও ছোট কাগজের প্রচ্ছদ করেছেন। একজন দক্ষ ফটোগ্রাফারও ছিলেন ।

১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি থানাধীন যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে দু’টি নৌকাডুবির তথ্যানুসন্ধান করতেই অসুস্থ শরীর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন গাইবান্ধায়। যাবার পথে ‘শেরেবাংলা’ নামক ফেরিতেই তিনি দুর্ঘটনার মুখে পতিত হন। ফেরির ছাদ থেকে হঠাৎ করেই পানিতে পড়ে যান। স্থানীয় নৌকার মাঝিরা তাঁর দেহ তাৎক্ষনিকভাবে উদ্ধার করতে পারলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ধারণা করা হয়, পানিতে পড়ার সাথে সাথেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে রংপুর শহরের মুন্সীপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে রংপুরবাসী ১৯৯৫ সালে এক নজিরবিহীন স্তব্ধ কর্মসূচী পালন করে, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং প্রেসক্লাবের আহবানে সেদিন বেলা বারোটা থেকে পরের দশ মিনিট থমকে থাকে রংপুর। যে যেখানে ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে যান প্রয়াত এই কলম সৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। নতুন ধরণের কর্মসূচী হিসেবে সে সময় আলোচিত হয়েছিল এই ঘটনা।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা : চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন তাঁর কর্ম জীবনের সাধনা ও স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৭ সালে রংপুর নাট্য সমিতি কর্তৃক সংবর্ধনা, ১৯৮৪ সালে পান সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক, আলোর সন্ধানে পত্রিকা তাঁকে ১৯৮৫ সালে সংবর্ধনা দেয়, ১৯৮৬ সালে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব বগুড়া কর্তৃক সম্মাননা সার্টিফিকেট অর্জন করেন, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য বাংলা ১৩৯৩ সালে পান ঐতিহ্যবাহী ফিলিপস্ পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে সংবাদপত্রে প্রভূত অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স পুরস্কার পান, রংপুর পদাতিক গোষ্ঠী তাঁকে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনা দেয় ১৯৮৮ সালে, বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার পান ১৯৯০ সালে, একই সালে লেখনীর মাধ্যমে প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রত্যক্ষ ও জনপ্রিয় করার দুরূহ প্রচেষ্টা চালানোর জন্য সমাজ ও প্রযুক্তি বিষয়ক পত্রিকা ‘কারিগর’ সম্মাননা পান, ১৯৯৫ সালে মর্যাদাশালী অশোকা ফেলোশিপ লাভ করেন, রংপুরের নাগরিক নাট্যগোষ্ঠী কর্তৃক তাঁকে পুরস্কার প্রদান করা হয় ১৯৯৬ সালে, ১৯৯৬ সালে তিনি লালমনিরহাট ফাউন্ডেশন ও উন্নয়ন সমিতি স্বর্ণপদক পান, ঢাকাস্থ রংপুর জেলা সমিতি তাঁকে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধিত করে ১৯৯৫ সালে, ১৯৯৭ সালে পান রংপুর জেলা প্রশাসন কর্তৃক গুণীজন সংবর্ধনা। খুলনায় তাঁকে রুমা স্মৃতি পদক প্রদান করা হয় ১৯৯৮ সালে। এছাড়া ওয়াশিংটনের পদ্মার ঢেউ বাংলা সম্প্রচার কেন্দ্র সম্মননা প্রদান করা হয় মোনাজাত উদ্দিনকে। তবে মোনাজাত উদ্দিন এই পুরস্কারের চাইতেও বড় পুরস্কার মনে করতেন মানুষের স্নেহ-শ্রদ্ধা ও ভালবাসাকে, যা তিনি অকুণ্ঠই পেয়েছেন।

১৯৯৭ সালে অর্জন করেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক একুশে পদক।

মোনাজাত উদ্দিনের প্রকাশিত গ্রন্থ : মোনাজাত উদ্দিন তাঁর সাংবাদিক জীবনে নানা মাত্রিকতার রিপোর্ট করেছেন। রিপোর্টিং ছাড়াও গল্প, কবিতা, ছড়া ও নাটক রচনায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তাঁর মৃত্যুর আগে ৯টি ও পরে ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি লিখেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ নানা ঘটনা। তাঁর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘পথ থেকে পথে’, ‘সংবাদ নেপথ্য’, ‘কানসোনার মুখ’, ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’, ‘নিজস্ব রিপোর্ট’, ‘ছোট ছোট গল্প’, ‘অনুসন্ধানী রিপোর্ট’: ‘গ্রামীণ পর্যায়’, ‘চিলমারীর এক যুগ’, ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনী’, ‘লক্ষীটারী’, ‘কাগজের মানুষেরা’।

এছাড়াও মাসিক মোহাম্মদি, দৈনিক আজাদ, সওগাত ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়। নাটকের একমাত্র প্রকাশিত বই ‘রাজা কাহিনী’। এছাড়া তিনি প্রচুর ছড়া লিখেছেন।

সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন নাসিমা আক্তার ইতির সাথে ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইতি রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেছেন। পরে সংসার জীবনে মনোনিবেশ করেন। মোনাজাতউদ্দিন ও নাসিমা আক্তার ইতি’র দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে মাহফুজা মাহমুদ চৈতি একজন ডাক্তার, ছোট মেয়ে হোসনাতুল ফেরদৌস সিঁথিও ডাক্তার এবং একমাত্র ছেলে আবু ওবায়েদ জাফর সাদিক সুবর্ণ ছিলেন বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। সে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৯৭ সালে আত্মহত্যা করে।

তথ্যসূত্র:  ইন্টারনেট অবলম্বনে এম আর জান্নাত স্বপন ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।