ওয়েব নিউজ ওয়েব নিউজ : ‘উত্তরবঙ্গে বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করেছে রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি, ঢাকা। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় রাজধানীর হোটেল ৭১-এর আ¤্রকানন হলরুমে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তারা বৃহত্তর রংপুরের উন্নয়নে শিল্পকারখানা স্থাপনের দাবি জানান। এজন্য গ্যাস সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি জোর দেন তারা। উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের জন্য করমুক্ত সুবিধা ও সর্বনি¤œ সুদে ঋণ প্রদানের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণও করে বক্তারা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, উত্তরবঙ্গ এক সময় মঙ্গা কবলিত এলাকা ছিল। এখন আর মঙ্গা শব্দটি নেই। এ অঞ্চলে আরও উন্নয়নের জন্য গ্যাস বিদ্যুৎ অপরিহার্য। এজন্য এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
উত্তরবঙ্গে স্পেশাল ইকনোমিক জোন করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেভাবে সারা বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে সেভাবেই রংপুর বিভাগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর। সেখানে চালের দাম বাড়িয়ে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতি কিছুটা হলেও সচল হবে।
তিনি আরও বলেন, রংপুর বিভাগ উন্নয়নের বাইরে থাকতে পারে না। কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য আরও বলেন, একটা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি থাকে দেশ তাহলে এগিয়ে যায়। গত ২০১৬-১৭ দুটি বছর আমাদের এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিলনা। ২০১৩-১৫ রাজনৈতিক অস্থিতিশীল করা হয়েছিল। যারা অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল দেশকে পঙ্গু করার চেষ্টা করেছিল তারা ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন আশা করি। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না। আমরা তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে চাই না। আমরাও জানি তিনি নির্বাচন করবেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনকালীন সময়ে অন্তর্বতীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে এবং সেই নির্বাচনে আমরা চাই যে সকলে অংশগ্রহণ করুক। একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং বিএনপি নির্বাচনে আসার বিকল্প কিছু নাই বলে আমি মনে করি। একটা দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যদি না থাকে তবে দেশে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়।
সেমিনারে অংশ নেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে রংপুর অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়াতে হবে। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে জমি ও শ্রমিক খুবই সস্তা। একই সঙ্গে নিজেদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আরডিজেএ’কে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। গ্যাসের অভাবে রংপুর অঞ্চলে শিল্প কারখানা গড়ে উঠছেনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে এই অঞ্চলে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। এর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে সাবকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো শিল্প গড়ে উঠবেনা। সেই সঙ্গে বন্দরগুলোতে বিদ্যামান সমস্যা সমাধানে সরকারকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য আহ্বান জানান তিনি।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, উন্নয়নের সুষম বণ্টন না হলে উত্তরবঙ্গের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। এজন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জনগণকে উন্নয়ন কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করানোর বিষয়ে জোর  দেন তিনি।
আনন্দ আলো সম্পাদক রেজানূর রহমানের সঞ্চালনায় এবং আরডিজেএ’র সভাপতি মহসীনুল করিম লেবুর সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, দেশবন্ধু গ্রুপের কর্ণধার গোলাম মোস্তফা, আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের নির্বাহী সভাপতি হাসানুজ্জামান হাসান, দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক শ্যামল কুমার ঘোষ, ঠাকুরগাঁও চেম্বারের সভাপতি হাবিবুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান প্রধান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
রংপুর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, বাংলাদেশের অন্যন্য অঞ্চলের চেয়ে রংপুর পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে রংপুর। গাইবান্ধার বালাসীতে ব্রহ্মপুত্রতে সেতু নির্মাণ করা গেলে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। এছাড়া উন্নয়নের জন্য গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিল্প কারখানা স্থাপন করলে হবে না। এর জন্য বাজার সম্পর্কে গবেষণা দরকার।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, উন্নয়নের জন্য সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের জন্য একটা এলাকার উন্নয়ন থেমে থাকতে পারেনা। জাপানে গ্যাস ছাড়াই শিল্পে বিপ্লব হয়েছে। উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের জন্য জ¦ালানী ছাড়াও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতি নজর দিতে হবে। এজন্য রেল যোগাযোগের উন্নতি করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে উত্তরবঙ্গে বিনিয়োগে সকল প্রকার সহায়তা দেয়ার আশ^াস দেন তিনি।
রূপালী ব্যাংকের সিইও ও এমডি আতাউর রহমান প্রধান বলেন, উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে নজর দেয়ার সময় হয়েছে। এজন্য কোনো ব্যাংক এককভাবে দায়িত্ব নেবে না। গতানুগতিক কৃষি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গ্যাসের দামে কিভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সেজন্য উত্তরবঙ্গের নাগরিকদের সোচ্চার হতে পাবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে দি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিশেষ প্রতিনিধি সিদ্দিক ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগে ৪৭.২% মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। দেশের মোট বিতরণকৃত লোনের মাত্র দুই শতাংশ যায় রংপুর অঞ্চলে। ক্রেডিট ডিমান্ড না থাকায় এ অঞ্চলে ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রমে আগ্রহী হচ্ছে না। এজন্য উদ্যোক্তা তৈরি এবং শিল্পকারখানা স্থাপনে কেউ এগিয়ে আসছেনা। যোগাযোগ্য ব্যবস্থাও এর অন্যতম অন্তরায়। বৃহত্তর রংপুরে প্রচুর উর্বর জমি রয়েছে। এখানে শ্রমিক সহজলভ্য।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল কবির আসিফ, সাবেক সভাপতি মুফদি আহমেদ, কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, বিএফইউজে’র যুগ্ম-মহাসচিব মোদাব্বের হোসেন ও নীলফামারী সাংবাদিক ফোরামের আহ্বায়ক মু. আ. কুদ্দুসও এতে বক্তব্য দেন ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।